হোম / বাংলাদেশ / জাতীয় সংবাদ / গুমের ৬১ দিন: চোখ বাঁধা অবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে শিলং, পাগল ভেবে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গুমের ৬১ দিন: চোখ বাঁধা অবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে শিলং, পাগল ভেবে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক | TCH News

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬

 

চোখ বাঁধা অবস্থায় সীমান্ত পেরিয়ে শিলং, পাগল ভেবে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিলাম: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

 

নিজের গুমের ৬১ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তাকে চোখ ও হাত বেঁধে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে স্থানীয়রা তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল।

 

শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে ‘মায়ের ডাক’ কর্তৃক আয়োজিত এক প্রদর্শনী ও প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

কবরের মতো কক্ষে ৬১ দিন

 

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুম অবস্থায় প্রতিটি মুহূর্তেই মনে হতো পরের ভোরটি দেখতে পাবেন কিনা। বন্দিদশায় দিনের আলো দেখার সুযোগ ছিল না। সকালের নাশতা এলে বুঝতেন সকাল হয়েছে। দেওয়ালে নখের আঁচড় দিয়ে দিন গুনতেন তিনি।

 

তিনি জানান, তাকে প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুটের একটি কবরের মতো সংকীর্ণ কক্ষে রাখা হয়েছিল। সেখানে একটি পানির কল এবং প্রস্রাব-পায়খানার জন্য একটি ছিদ্র ছিল। দুর্গন্ধের পাশাপাশি সেখানে বিষাক্ত পোকামাকড়ও দেখা যেত। মেঝেতে একটি কম্বল পেতে ঘুমাতে হতো ও একটি পাতলা বালিশ দেওয়া হয়েছিল।

 

খাবার, পানি ও ওষুধ নিয়মিত দেওয়া হলেও অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসকের সহায়তা মিলত না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি গুমকারীদের নিজের শারীরিক জটিলতার কথা জানিয়ে বলতেন, তার হার্টে স্টেন্টিং আছে, কিডনিতে জটিলতা রয়েছে। তিনি তাদের বলেছিলেন, এই পরিবেশে কতক্ষণ টিকে থাকবেন জানেন না। মৃত্যু হলে তার লাশ যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

 

একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খাবার দিতে এসে তার সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা খোলা হয়। পরে তাকে গামছা ফেলে টেনে তোলা হয়। তখন বুকের তীব্র ব্যথার কথা জানালে তাকে বলা হয়, সেখানে ডাক্তার আসা নিষেধ। নিজে নিজে সুস্থ থাকার চেষ্টা করতে বলা হয়।

 

 

এর কিছুদিন পর তাকে অন্যত্র নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন সকালে পানি কম খেতে বলা হয়েছিল। তখন তার মনে হয়েছিল হয়তো ওইদিনটিই তার শেষ দিন।

 

তাকে মোটা কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা হয়। এরপর হাত বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়িতে আরও কয়েকজন মানুষ ছিল বলে তিনি ধারণা করেন। কয়েক ঘণ্টা যাত্রার পর একটি স্থানে দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসিয়ে রাখা হয়। পরে তাকে কিছুটা হাঁটিয়ে একটি জিপের মতো গাড়িতে তোলা হয়। এরপর আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটি উঁচু জায়গায় নেওয়া হয়। সেখানে মানুষের হিন্দিতে কথা বলার শব্দ শুনে তিনি নিশ্চিত হন যে তাকে ভারতের কোনো অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

শিলংয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’

 

আরও কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে যাওয়ার পর ভোরের দিকে তার চোখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। তখন তিনি একটি চৌরাস্তা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ও একটি বড় মাঠ দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন, সেটি শিলংয়ের গলফ লিংক এলাকা। তাকে একটি নির্জন স্থানে ফুটপাতে নামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাউ’।

 

তখন তার পা ফুলে যাওয়ায় ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। আশপাশের পথচারীদের কাছে সাহায্য চান। কিন্তু তার দাড়ি, ময়লা পোশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে অনেকে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি মনে করেছিলেন।

 

পুলিশও প্রথমে বিশ্বাস করেনি

 

পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তাকে একটি বিট হাউসে নেওয়া হয়। সেখানেও নিজের পরিচয় দেওয়ার পর প্রথমে তাকে বিশ্বাস করা হয়নি। এরপর তাকে শিলং সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে নর্থ ইস্টার্ন ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সায়েন্সেসে (মিমহানস) নেওয়া হয়।

 

সেখানে এক চিকিৎসকের কাছে নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশের পরিবারের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। তিনি চিকিৎসককে বলেন, ফোন করে জানতে পারেন তিনি কে এবং তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

 

 

একপর্যায়ে তার দেওয়া নম্বরে বাংলাদেশে ফোন করার চেষ্টা করা হয়। তার স্ত্রী তখন বাইরে থাকায় প্রথমে ফোন ধরতে পারেননি। পরে বিদেশি নম্বর দেখে তিনি কলব্যাক করেন। সালাহউদ্দিন বলেন, ফোনে নিজের পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার স্ত্রী চিৎকার করে বলেন, ‘আমি জান্নাত পেয়ে গেছি।’ তিনি ওই মুহূর্তটিকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

 

‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’

 

পরে তাকে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকের মাধ্যমে তার মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা হয়। পুলিশের কঠোর নজরদারির মধ্যেও কোনো একটি ভারতীয় টেলিভিশন ক্যামেরা দূর থেকে তাকে ধারণ করে। সেখানে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য তিনি বলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন।’ পরে ওই ভিডিও বাংলাদেশে প্রচারিত হয়।

 

এরপর তাকে ভারতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর আদালতে আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পথ তৈরি হয়।

 

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরতে পারার পেছনে বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবদান রয়েছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তারা দীর্ঘ ফ্যাসিজম থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন এবং গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছেন।

 

The Continental Herald (TCH News) is committed to delivering accurate, timely, and trustworthy news. Stay connected with The Continental Herald for the latest updates from Bangladesh and around the world.

Share
Scroll to Top